রোকেয়া আবিষ্কার এবং পুনরাবিষ্কারের অপেক্ষায়
রোকেয়া যতটা উচ্চারিত, তার খুব সামান্যই পঠিত এবং গৃহীত। কারণ আজও তিনি নানা খণ্ডীকরণের খপ্পড়ে অবরুদ্ধ। ‘মুসলিম নারী শিক্ষার অগ্রদূত’, ‘নারী জাগরণের প্রতীক’, ‘মুসলিম সমাজ সংস্কারক’, ‘ইসলামী নারীবাদী’, ‘আমূল নারীবাদী’, ‘বিশিষ্ট মুসলিম লেখিকা’ ইত্যাদি নানা পরিচয়ে রোকেয়ার সংকোচন ঘটেছে। তার কালের জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সামগ্রিকভাবে রোকেয়ার মূল্যায়ন এখনও অনুপস্থিত।
এই কারণেই বোধ হয় ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত শামসুন নাহার মাহমুদ রচিত ‘রোকেয়ার জীবনী’ গ্রন্থের ভূমিকায় প্রখ্যাত সাহিত্যিক পণ্ডিত অধ্যাপক সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন—“কিন্তু রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাস্তবিক যে কত বড় ছিলেন, তাহা বাহিরের লোকেদের কাছে অজানা রহিয়া গেল। এই অজানার অন্ধকার আমাদের আদৌ কাটেনি বরং রোকেয়া দিবস, রোকেয়া পদক, রোকেয়ার নামে নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির আনুষ্ঠানিকতায় তাঁকে উঁচুতে উঠিয়ে অচেনা করে সাধারণের কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ যেন ‘তোমার পুজার ছলে তোমায় ভুলে থাকা’।”
রোকেয়ার জীবন ছিল তিনটি অধ্যায়ে বিস্তৃত। জন্ম (১৮৮০ সাল) ও শৈশব-কৈশোর কেটেছে রংপুরের পায়রাবন্দে, বিয়ের (১৮৯৮ সাল) পর ভাগলপুরে এবং স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯১১ সালে সাল থেকে আমৃত্যু কলকাতায়।
এই যাবৎকাল পর্যন্ত আমরা রোকেয়া চর্চার মধ্যে পাই—রোকেয়া পিতা-মাতা, ভাই-বোনসহ পরিবারের পরিচয়, তৎকালীন সমাজের—বিশেষত মুসলিম সমাজের অবস্থা, রোকেয়ার বেড়ে ওঠা ও গৃহে লেখাপড়ার প্রচেষ্টা, বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন, স্বামীর মৃত্যুর পর প্রথমে ভাগলপুর—পরে কলকাতায় মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা, তাঁর নিঃসঙ্গতা, সাহিত্য কর্ম ও কিছুটা সমাজকর্ম ইত্যাদি বিষয়। কিন্তু এই সব বিবরণমূলক রচনায় স্বয়ং রোকেয়া কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেন না। ফলে তাঁর স্বকীয়তা, মৌলকত্ব, অনন্যতা, ব্যক্তিত্ব, তীক্ষ্ণধী, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, কর্মকৌশল—এই সব খুব সামান্যই উদ্ভাসিত হয়। ফলে বাংলার নবজাগরণের মানসকন্যা, মানবতাবাদী, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক, স্বদেশী, জাতীয়তাবাদী, সংগঠক, নারীমুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী, সমাজ সংস্কারক, মৌলবাদবিরোধী অসাম্প্রদায়িক—রোকেয়ার এই সব পরিচয় ঝাপসা হয়ে আসে।
বিয়ের পর বিহারের ভাগলপুরে সাহিত্য, রচনার মধ্য দিয়ে তৎকালের বিদগ্ধ সমাজে কিছুটা আলোড়ন তুলে রোকেয়ার প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে বিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুতে।
গবেষকদের প্রাপ্ত হালনাগাদ তথ্য মতে রোকেয়ার প্রথম রচনা ‘পিপাসা’ প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে হরেন্দ্রনাথ রায় ও জ্ঞানেন্দ্র লাল রায় সম্পাদিত ‘নবপ্রভা’ পত্রিকায়। ওই একই সময় তিনি তার একমাত্র উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’ রচনা করেন যা অনেক পরে ১৯২৪ সালে প্রকাশ লাভ করে।
লক্ষ্যণীয় যে মহররমের মত ধর্মীয় বিষয় নিয়ে এটি লেখা এর হলেও মূলভাব সার্বজনীন। যেমন উল্লেখ করা যায়—‘...পিপাসা…পিপাসা—মূর্খ মানব! জান না এ কিসের পিপাসা? ...এ হৃদয়ের দুর্দান্ত পিপাসা যেমন কেমন করিয়া দেখাইব? আমার হৃদয় যত গভীর, পিপাসাও তত প্রবল! এ সংসারে কাহার পিপাসা নাই? ...ধনীর ধন-পিপাসা, মানীর মান-পিপাসা, সংসারীর সংসার-পিপাসা। নলিনীর তপন-পিপাসা, চকোরির চন্দ্রিকা-পিপাসা! অনলেরও তীব্র পিপাসা আছে! পিপাসা না থাকিলে ব্রহ্মাণ্ড ঘুরিত কী লক্ষ্য করিয়া?…’
১৯০৩ সালে গিরিশ চন্দ্র সেন সম্পাদিত মহিলা পত্রিকায় রোকেয়া তাঁর প্রথম বিস্ফোরক লেখা লেখেন। ‘অলংকার না Badge of Slavery?’ পরে ‘আমাদের অবনতি নামে’ (পরে এর পরিমার্জিত রূপ ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’)নবনূরপত্রিকাতেও তা ছাপা হয়। তাঁর এই লেখা ও পরে লেখা ‘অর্ধাঙ্গী’ সে সময়ে প্রবল বিতর্কের ঢেউ তোলে। তিনি শিক্ষিত বিদগ্ধ মহলের তীব্র বিরোধীতার সম্মুখীন হন তার নারীমুক্তিকামী অগ্রসর চিন্তার কারণে। শুধু মুসলিম সমাজের তৎকালীন বিখ্যাত ব্যক্তিরাই তাঁর প্রতি বিক্ষুব্ধ মনোভাব প্রকাশ করেননি, সেই সঙ্গে হিন্দু সমাজের প্রগতিশীল অংশও তাঁর সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। তাই আমরা দেখি রোকেয়ার নারী-পুরুষের সাম্যের চিন্তাকে আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, সৈয়দ এমদাদ আলী, এ এ আল মুসাভী, নওশের আলী খান ইউসুফজীর মত বিদ্বানরা মেনে নিতে পারেননি। তেমনি কালের বিচার অগ্রসর রোকেয়ার নারী ভাবনাকে ‘ঠাকুমার ঝুলি’র লেখক দক্ষিণারঞ্জন মিত্রের মত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments